বাজারে এলপিজি সংকটে দাম চড়া
ওয়েভ রিপোর্ট
০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ২৩:৫১
দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাজারে এখনো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি।
দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার পরও দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহসংকট কাটেনি। পরিবেশকেরা বলছেন, মাত্র ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত সরবরাহ করছে, তাদের কাছেও চাহিদামতো এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাজারে এখনো ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি।
৪ অক্টোবর এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। প্রতি মাসেই দাম সমন্বয় করে সংস্থাটি। গত মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরের জন্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে সংস্থাটি। যদিও বাজারে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে ৬ অক্টোবর বিইআরসিকে একটি চিঠি দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। চিঠিতে বলা হয়, বিইআরসি দাম নির্ধারণের দিন সন্ধ্যা থেকে এলপিজি কোম্পানিগুলো নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছে। এতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছে তারা। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, লাইসেন্স ফি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
চিঠিতে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি বলেছে, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গোডাউন পর্যন্ত আনতে প্রতি সিলিন্ডারে ভাড়া ৫০ টাকা। সিলিন্ডার ট্রাকে ওঠানো-নামানো ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছাতে খরচ ৩৫ টাকা। আর কর্মচারী, গোডাউন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খরচ মেটাতে ২৫ টাকা লাগছে। প্রতি সিলিন্ডারে ৪০ টাকা মুনাফা চায় তারা। এতে সব মিলে সিলিন্ডারপ্রতি পরিবেশক পর্যায়ে ১৫০ টাকা দরকার। পাঁচ বছর ধরে তারা পাচ্ছে ৫০ টাকা করে। ফলে ১০০ টাকা করে ঘাটতি থাকছে। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির দামে পার্থক্য থাকায় বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য স্বার্থ এবং ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান স্বাক্ষরিত এ চিঠির অনুলিপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিয়েছে তারা।
অবশ্য বিইআরসি বলছে, পাইকারি পর্যায়ে বিইআরসি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা। প্রতি সিলিন্ডারে ৫০ টাকা কমিশন পান পরিবেশকেরা। তাঁরা খুচরা বিক্রেতার কাছে ১ হাজার ৭৯২ টাকায় বিক্রি করার কথা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির চিঠি তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু গণশুনানি ছাড়া এসব খরচ সমন্বয়ের সুযোগ নেই। তাঁদের প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে আগামী রোববার কমিশন সভায় আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হবে। তবে নতুন সিদ্ধান্তের আগপর্যন্ত তাঁরা যাতে নির্ধারিত দামে বিক্রি করেন, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। ওই সময় সিলিন্ডারপ্রতি পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এখন পরিবেশকেরা এটি বাড়ানোর দাবি করছেন। যদিও অভিযোগ আছে, বাজারে নির্ধারিত দামে বিক্রি হয় না। মাঝেমধ্যেই সরবরাহ সংকটের নামে এটি অনেক বেড়ে যায়। বাড়তি দাম দিয়েও এলপিজি পায় না ভোক্তা।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। ২০১৫ সালে আবাসিকে গ্যাস–সংযোগ বন্ধের পর থেকে দেশে এলপিজির চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়তে থাকে। প্রতিবছর এলপিজির চাহিদা এখন ১৫ লাখ টনের বেশি। এ খাতের ৯৯ শতাংশ বেসরকারি, যারা আমদানি করে সরবরাহ করে। রান্নার পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহনে এলপিজি ব্যবহৃত হয়।
পরিবহনে এলপিজি সরবরাহের স্টেশনেও চাহিদামতো এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।
এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব বলছে, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। তার মানে আমদানি স্বাভাবিক আছে। সরবরাহ বাড়তে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
এলপিজি পরিবেশকেরা বলছেন, ২০ সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে কিছু কোম্পানি। মূলত মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, আইগ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স ও বিএম বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। তারা বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি করছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি কোম্পানি মাঝেমধ্যে খুবই অল্প পরিমাণে দিচ্ছে। এরা আবার বাড়তি দাম নিচ্ছে। আবার কোনো কোনো কোম্পানি এলপিজি সরবরাহ না করলেও ১ হাজার ৯৬০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যতালিকা দিয়েছে। চাহিদামতো এলপিজি না পাওয়ায় খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করলে প্রতি সিলিন্ডারে ১৫০ টাকা লোকসান হবে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা বেশি দামে বিক্রি করছেন। এর মধ্যে চলছে অভিযান ও জরিমানা। বিইআরসি দাবি না মানলে তাঁরা এলপিজি বিক্রি বন্ধ রাখার কথাও চিন্তা করছেন।
এলপিজির বাড়তি দাম ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান চালাচ্ছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সংস্থার পরিচালক আতিয়া সুলতানা জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে সিলিন্ডার গ্যাসের বিক্রি তদারকি করতে ২৪২টি অভিযান পরিচালনা করেছে সংস্থাটি। এসব অভিযানে ৪৭৮টি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়।