‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’ দাবি নিয়ে টনির ৭৮৩ কিমি পদযাত্রা
ওয়েভ লাইফ
০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৩
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কৈখালী পাঁচ নদীর মুখ। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সেখান থেকেই হাঁটা শুরু করেছিলেন পরিব্রাজক মাসফিকুল হাসান টনি। সামনে তখন ৭৮৩ কিলোমিটারের পথ। দীর্ঘ এই পথে কখনো সুন্দরবনের জঙ্গল, কখনো উত্তাল নদী, কখনো কাদামাটি আর চর, কখনো পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়েছেন। অবশেষে ২২ দিন পর সেই হাঁটা থামল কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ঘোলারচরে। উপকূলের পথে হেঁটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বার্তা বিলি করা টনির সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্প শুনেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ।
হাঁটতে হাঁটতে একটা দেশের উপকূলকে কতটা চেনা যায়? মানচিত্রে যে উপকূল কেবল একটি রেখা, সেই রেখার ভেতরে ঢুকে গেলে দেখা যায় তার আরেক চেহারা। নদীর পানি, জোয়ারের টান, কাদায় আটকে থাকা পথ, বন, পাহাড়, চর, সমুদ্র আর মানুষের জীবন। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই হেঁটেছেন টনি।
বাংলাদেশ কোস্টাল ট্রাভার্স নামের এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ থেকে স্নাতক করা টনি বর্তমানে বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। পরিব্রাজক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছেন। এবার তাঁর পথের গন্তব্য ছিল বাংলাদেশের উপকূল।
কৈখালী থেকে তাঁর অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথমেই ছিল সুন্দরবন। এই অভিযানে সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। বন পেরোনোর অভিজ্ঞতা আর অন্য কোনো পথের মতো নয়। একদিকে গভীর সবুজ, অন্যদিকে নদী-খালের জাল। পথের সঙ্গে বদলেছে চারপাশের শব্দ, গন্ধ, মাটি এবং মানুষের জীবন।
সুন্দরবন পেরিয়ে পথ যত এগিয়েছে, ততই বদলেছে ভূপ্রকৃতি। এসেছে নদী। শিবসা, বলেশ্বর, বিষখালী, আন্দারমানিক, রামনাবাদ থেকে মহেশখালী চ্যানেল। সাঙ্গু ও মাতামুহুরীসহ আরও অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল পেরিয়ে এগিয়েছেন টনি।
কিছু নদী ছিল শান্ত। কিছু আবার ছিল অস্থির। উপকূলে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত থাকার সময় তেঁতুলিয়া ও মেঘনা নদীও অতিক্রম করতে হয়েছে। দীর্ঘ এই যাত্রায় প্রকৃতি সব সময় পথকে সহজ করে দেয়নি।
কখনো পায়ের নিচে কাদামাটি, কখনো পাথর। কখনো ঘন জঙ্গল, আবার কখনো বিস্তীর্ণ চর। মীরসরাই ও সীতাকুণ্ডের বেড়িবাঁধসংলগ্ন জঙ্গলপথ যেমন ছিল, তেমনি ছিল মহেশখালীর পাহাড়ি পথ। আবার একসময় পথ মিলেছে বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়কের সঙ্গে।
একই অভিযানে সুন্দরবনের গভীর সবুজ থেকে পাহাড়, তারপর সমুদ্র। বাংলাদেশের উপকূল যেন নিজেই একেক দিন একেক রূপ নিয়ে সামনে এসেছে টনির। তবে এই যাত্রায় প্রকৃতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে মানুষ। পথের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের জীবন, জীবিকা, পানি, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা শুনেছেন তিনি। কোথাও নাগরিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এসেছে, কোথাও পরিবেশকর্মীরা, কোথাও স্থানীয় মানুষ।
মোংলা, তালতলী, কলাপাড়া, বাঁশখালী, পেকুয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার, হিমছড়ি ও টেকনাফে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অভিযানের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে স্থানীয় নাগরিক সংগঠন ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর আঞ্চলিক প্রতিনিধি ও সদস্যরা।
ফলে টনির একার হাঁটা একসময় আর একার থাকেনি। পথে পথে যুক্ত হয়েছে মানুষ। কোথাও আলোচনা হয়েছে উপকূল রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, কোথাও নিরাপদ পানি নিয়ে, কোথাও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে। আর সবকিছুর ভেতর দিয়ে সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন—উপকূলের এই মানুষ ও প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থা কেমন হবে?
টনির এই দীর্ঘ অভিযান ছিল ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’ শীর্ষক মাসব্যাপী ক্যাম্পেইনের অংশ। ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) ও বেঙ্গল পিস ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে হওয়া অভিযানে সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল আরও ৩৫টি সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন।
বার্তাটি খুবই সহজ। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বাড়াতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। একই সঙ্গে উপকূলের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য সমাধান এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এই বার্তা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই ১১টি উপকূলীয় জেলা পেরিয়েছেন টনি। খুলনা থেকে বরিশাল, সেখান থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূল। একেক জায়গায় একেক বাস্তবতা। কিন্তু সংকটের জায়গাগুলোতে ছিল একটি মিল—প্রকৃতি বদলাচ্ছে, আর সেই বদলের চাপ সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছে উপকূলের মানুষ।
দীর্ঘ ২২ দিনের অভিযান শেষে ৫ অক্টোবর বিকেল ৪টায় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের ঘোলারচরে পৌঁছান টনি। কৈখালীর পাঁচ নদীর মুখ থেকে শুরু হওয়া পথ এসে থামে সমুদ্রঘেঁষা সেই প্রান্তে।
হিসাব করলে ৭৮৩ কিলোমিটার। কিন্তু একজন পরিব্রাজকের কাছে এই পথ কেবল কিলোমিটারের সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে আছে সুন্দরবনের ১৬৫ কিলোমিটার, বিপদসংকেতের মধ্যে নদী পাড়ি দেওয়ার অভিজ্ঞতা, কাদা-পাথর-জঙ্গল-পাহাড়ের পথ, অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা এবং উপকূলের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ।