মহানবীকে (সা.) শাসনের অধিকার ছিল যে নারীর
ওয়েভ ফেইথ
১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:০০
ইসলামের ইতিহাসে এমন একজন নারী আছেন, যিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে শাসন করতে পারতেন। তিনি নবীজির মুখের ওপর কথা বলার সাহস রাখতেন, যা মদিনায় আর কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই নারীর সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং বিশ্বনবী বিনয়ে মাথা নত করতেন। তিনি ছিলেন নবীজির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ছায়াসঙ্গী।
৫৭০ খ্রিস্টাব্দ। মক্কা নগরীর একটি ছোট ঘর। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। মা আমিনা প্রসববেদনায় কাতর, আর তাঁর পাশে পরম ভরসা হয়ে আছেন উম্মে আয়মান। ঠিক সেই মুহূর্তে এক পবিত্র আলোয় ঘরটি ভরে গেল। ভূমিষ্ঠ হলেন বিশ্বনবী (সা.)। উম্মে আয়মান পরম মমতায় নবজাতককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন। তিনিই প্রথম মহানবীকে কোলে তুলে নেন, পরিষ্কার করেন এবং পরম যত্নে গোসল করান। আব্দুল্লাহর শূন্য ঘরে উম্মে আয়মানই সেদিন হয়ে উঠেছিলেন স্নেহের প্রথম আশ্রয়।
উম্মে আয়মান ছিলেন আবিসিনিয়া বা বর্তমান ইথিওপিয়ার অধিবাসী। শৈশবে তিনি দাসী হিসেবে আরবে আসেন। রাসুল (সা.)-এর বাবা আব্দুল্লাহ বিয়ের আগেই উম্মে আয়মানকে দাসী হিসেবে তাঁর ঘরে নিয়ে আসেন। তিনি অত্যন্ত দরদ দিয়ে আব্দুল্লাহ ও আমিনার সেবা করতেন। অল্প দিনেই তিনি এই পরিবারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও আপন সদস্য হয়ে ওঠেন।
নবীজির বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, মা আমিনা তাঁকে নিয়ে মদিনায় আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে মক্কায় ফিরছিলেন। পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে মা আমিনা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। নির্জন মরুভূমিতে উম্মে আয়মান দিশেহারা হয়ে পড়লেন। ছোট্ট মুহাম্মদ তাঁর মায়ের শিয়রে বসে ব্যাকুল হয়ে ডাকছেন। আমিনা শেষবারের মতো তাঁর কলিজার টুকরাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। সেই খাঁ খাঁ মরুভূমিতে মা আমিনাকে কবর দিয়ে উম্মে আয়মান এতিম শিশু মুহাম্মদকে বুকে চেপে ধরে মক্কায় ফিরে আসেন। এরপর জীবনে কখনোই তিনি আর মুহাম্মদকে ছেড়ে যাননি।
নবীজি যখন নবুওয়াত পেলেন, তখনও তিনি উম্মে আয়মানকে দেখলে সম্মান জানিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন। নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দিতেন। তিনি বলতেন— "ইনি আমার পরিবারের একমাত্র অবশিষ্ট সদস্য, ইনি আমার মায়ের পর আরেক মা।" ছোটবেলা থেকে লালন-পালন করার কারণে উম্মে আয়মানের মনে নবীজির প্রতি এক ধরনের মাতৃত্বসুলভ অধিকার ছিল। নবীজিও সেটা মেনে নিতেন।
সুনানে আবু দাউদ এবং শামায়েলে তিরমিজিতে বলা আছে, একবার উম্মে আয়মান নবীজির কাছে একটি বাহন চাইলেন। নবীজি কিছুটা কৌতুক করে বললেন, আমি আপনাকে একটি উটের বাচ্চার ওপর সওয়ার করাবো। এটি শুনে তিনি কিছুটা রেগে গিয়ে শাসনের সুরে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন? উটের বাচ্চা আমার ভার কীভাবে সইবে? নবীজি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, রাগ করবেন না। দুনিয়ার প্রতিটি উটই তো আসলে কোনো না কোনো উটের বাচ্চা। এমন খুনসুটি আর আবদার কেবল তিনিই করতে পারতেন।
ইসলামের প্রথম পর্বে যেসব নারী–পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন উম্মে আয়মান তাঁদের একজন। তিনি মদিনায় হিজরতকারী সাহাবী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তিনি ওহুদ ও খয়বরের যুদ্ধে অংশ নিয়ে সৈনিকদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা করতেন। ইসলামের প্রতি তাঁর অটল বিশ্বাস তাঁকে ইতিহাসের অনন্য এক সাহাবীতে পরিণত করেছে।
সহীহ মুসলিমে বলা আছে- নবীজির মৃত্যুর পর খলিফা আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) তাঁকে দেখতে যান। তাঁরা গিয়ে দেখলেন উম্মে আয়মান অঝোরে কাঁদছেন। তাঁরা সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কাঁদবেন না, নবীজি তো আল্লাহর কাছে শান্তিতে আছেন। উম্মে আয়মান চোখের পানি মুছে উত্তর দিলেন, আমি নবীজির জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি কারণ— আজ থেকে আসমান থেকে ওহী আসা বন্ধ হয়ে গেল! তাঁর এই গভীর উপলব্ধিবোধ দেখে দুই প্রতাপশালী খলিফাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
উম্মে আয়মান (রা.) ছিলেন সেই মা, যাঁর কোলে মাথা রেখে শান্তির নিঃশ্বাস নিতেন বিশ্বনবী। তিনি প্রমাণ করেছেন, নিখাদ ভালোবাসা থাকলে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষটিকেও স্নেহের শাসনে আগলে রাখা যায়।