সৃজনশীলতার সংকটের ভিড়ে ব্যতিক্রমী এক উপন্যাস পাঠ-অনুভব
ওয়েভ লাইফ
১৮ মে, ২০২৬, ০০:০০
ইদানিং নতুন প্রজন্মের অনেক লেখকের মৌলিক কাজের ক্ষেত্রে এক ধরনের সৃজনশীলতার অভাব অনুভূত হয়। গতানুগতিক গল্পের প্লট ও চরিত্র নির্মাণে মনে হয় সাহিত্যে একধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এর পেছনে হয়ত সময়ের চাপ, দ্রুত প্রকাশের প্রবণতা, বাজারের চাহিদা এসব মিলিয়েই লেখালেখির গভীর প্রস্তুতির জায়গাটা হয়ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে লেখার ভেতরে গল্প থাকছে, কিন্তু গল্পের ভেতরের জগতটি পূর্ণতা পাচ্ছে না। পাঠক এখন চরিত্রের ভেতরে প্রবেশ করার বদলে কেবল ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেই থেমে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই কারণেই আজকাল নতুন বই প্রকাশিত হলেও আগের মতো সেই তীব্র কৌতূহল সৃষ্টি করছে না। পাঠক যেন আগেভাগেই অনুমান করতে পারেন বাংলা সিনেমার গল্পের মতো, এ গল্পের সীমানা কোথায় গিয়ে থামবে। পরিচিত কাঠামোর ভেতরেই ঘুরপাক খেতে থাকা গল্পগুলো হৃদয়ে দাগ ফেলে না। ফলে কাহিনি এগোয়, কিন্তু তা পাঠকের নতুন কোনো দিগন্ত খুলে দেয় না। এই সামগ্রিক প্রবণতার মাঝে যারা সেই পরিচিত গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন, তাদের রয়েছে প্রতিযোগীতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার শংকা, তবে আলটিমেটলি সেইসব গন্ডিছাড়া কাজই সাহিত্য প্রেমীদের নিকট দিনশেষে আলাদা করে চোখে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক।
অনেকদিন বই হাতে নেওয়া হয়নি। এই বইটি হাতে পাওয়ার পর আমার মনে প্রশ্নের উদয় হলো, সত্যিই কি এতে এমন কিছু আছে, যা আমাকে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে? মলাটটা উল্টে-পাল্টে দেখতে গিয়েই মনে হলো এর নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি, আর প্রচ্ছদের নিঃস্তব্ধ সৌন্দর্যের ভেতরে জমাট বেঁধে আছে রহস্যের মেঘ। সেই প্রথম দেখাতেই তৈরি হলো এক অদ্ভুত কৌতূহল, কেন যেন মনে হলো, এর প্লটের ভেতরে থাকলেও থাকতে পারে অন্য এক জগৎ।
কিন্তু পড়তে পড়তেই সেই সংশয় ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করল। খুব বেশি সময় লাগল না বুঝতে, বইটি খানিকটা ব্যতিক্রমি। বেশ খানিকদূরে এগিয়ে যাবার পরে মনে হয়, আসলে এর ভেতরে এমন কিছু ঘটনা আছে, যা মানুষের কিছু কিছু কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়।
বাংলা সাহিত্যে দ্বীপকে কেন্দ্র করে অসংখ্য গল্প রচিত হয়েছে, সমুদ্রকে ঘিরে নির্মিত হয়েছে নাটক, টেলিফিল্মও কম নয়। কিন্তু কোনো দ্বীপকে নৃবিজ্ঞান, জীবনবিদ্যা এবং রহস্যময় প্রকৃতির সমন্বয়ে এমনভাবে নির্মাণ সচরাচর দেখা যায় না। আইল অব সিরেনিটি সেই অর্থে একটি ব্যতিক্রমী রচনা। এটিকে শুধুমাত্র উপন্যাস মনে হয়নি বরং এ যেন এক অনুসন্ধানী ডায়াগ্রাম, যেখানে প্রতিটি পৃষ্ঠা পাঠককে রীপ কারেন্টের মতো একটু একটু করে গভীরে টেনে নেয়।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জেনকি। তাকে কেন্দ্র করেই গল্পের বিস্তার। বইটি শুরুর সময় মনে হয় এক তার সাথে আমার অদেখা দ্বীপে হারিয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা। এ অংশে ভীতিকর কিছু বিষয় রয়েছে যা অনেকটা সন্মুখ যুদ্ধের আবহ তৈরী করে। এ ছাড়া বাকি অংশ প্রশান্তিময় এবং অপ্রত্যাশিত গল্পের মোড়ে ঠাসা। আমার নিকট সবচেয়ে অবাক করা বিষয় যেটা মনে হয়েছে সেটা অসম বয়সের জুটি। একজনের বয়স যখন নব্বইয়ের কোটায় তখন অন্যজন মাত্র পনেরর কোটায়। এই দুই চরিত্রের মধ্যে ভারসাম্য উপন্যাসটিকে ব্যাতিক্রমি এক মাত্রায় নিয়ে গিয়েছে।
উপন্যাসটির আরও একটি উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো সায়েন্টিফিক রহস্যময়তা। বাংলা ভাষায় আমরা রহস্যোপন্যাস পড়েছি, অলৌকিকতার গল্পও পড়েছি, কিন্তু এখানে লেখক রহস্যকে কুসংস্কারের পথে না নিয়ে বিজ্ঞানের সম্ভাবনার দিকে এগিয়েছেন। দ্বীপের বাতাসে কী আছে? কেন মানুষ বদলে যায়? কেন হারানো স্মৃতি জেগে ওঠে? কেন সময়ের সঙ্গে অনুভূতি পরিবর্তিত হয়? এই প্রশ্নগুলো যেকোন পাঠককে ভাবাবে।
বইটি পড়তে পড়তে অজান্তেই ঝালাই হয়ে যায় আধুনিক নিউরোসায়েন্স, পরিবেশবিজ্ঞান, জেনেটিক স্মৃতি, এমনকি কোয়ান্টাম চেতনা নিয়ে নানা তত্ত্ব ও ভাবনা। গল্পের কিছু কিছু অংশে গল্পের ধীর হয়ে আসে যেটা অনেক পাঠক বিরতিগুলোতে চিন্তা অবকাশ পান এবং যেন গল্পের ভেতর দিয়েই এক ধরনের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথ খুলে।
উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী সংলাপ হলো, চরিত্রগুলোর নীরবতা। গোত্রপ্রধান, শাস্ত্রী এবং তানাকির মায়ের কথোপকথনের মাঝে যে নীরবতা কাজ করে, তা অনেক সময় উচ্চারিত সংলাপের চেয়েও বেশি কিছু বলে দেয়।
পড়া শেষ করে বুঝলাম, আমার ধারণা ভুল ছিল না, বইটি সত্যিই ব্যতিক্রমী। সাধারণত উপন্যাসের শুরুতে রহস্যের বীজ বোনা হয়, আর শেষে এসে সেই জট খুলে যায়। কিন্তু এখানে নির্মাণটা উল্টো। শুরুতে যেন সবকিছু স্বাভাবিক, আর রহস্য ধীরে ধীরে জমতে জমতে শেষভাগে এসে একসঙ্গে বিস্তার লাভ করে। আশ্চর্যের বিষয়, সেই জট পুরোপুরি খোলে না; বরং আরও জটিল হয়ে ওঠে। আর ঠিক সেখানেই পাঠক থেমে যান, ভাবতে বাধ্য হন।
সবশেষে বলতে হয়, এটি এমন এক বই, যা শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও শেষ হয়ে যায় না। যেন বৃষ্টির রাণীর ঝর্ণার শব্দ দীর্ঘক্ষণ কানে বাজতে থাকে, আর মনে প্রশ্ন জাগে, এই বই কি সত্যিই মানসিক প্রশান্তি আনয়ন করে নাকি হারানো যৌবনের ফের উচ্ছল ঢেউ আবারও জাগিয়ে তোলে?
লিখেছেন—রেজাউল করিম