বাবাকে শেষ বিদায় জানালেন মেসি
ওয়েভ স্পোর্টস
১১ আগস্ট, ২০২৬
আর্জেন্টাইন ফুটবল আইকন লিওনেল মেসি রোববার (৯ অগাস্ট) তাঁর বাবা হোর্হে মেসিকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন। শৈশব থেকেই বিশ্বখ্যাত এই তারকার আবেগের আশ্রয় ও এজেন্ট হিসেবে পাশে থাকা হোর্হে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর গত ৮ অগাস্ট ৬৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসি শনিবার গভীর রাতে মায়ামি থেকে একটি ব্যক্তিগত বিমানে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও সন্তানদের নিয়ে আর্জেন্টিনায় পৌঁছান।
রোসারিওর পাশের শহর পেরেজের একটি কবরস্থানে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য এবং আর্জেন্টিনা দলের কয়েকজন সতীর্থকে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়। শহরের এল প্রাদো কবরস্থানের ফটকে সমর্থকদের হাতে লেখা বার্তা দেখা যায়, “শক্ত থাকো, লিও, আমরা তোমাকে ভালোবাসি” এবং “শক্ত থাকো, মেসি পরিবার”। ফটকের পাশে ছিল একটি বড় ফুলের তোড়া।
শুক্রবার রাতে রোসারিওর একটি ক্লিনিকে হোর্হে মেসির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর সতীর্থরা তাঁদের অধিনায়কের পাশে দাঁড়ান। “নিশ্চয়ই আমরা সেখানে থাকলে তাঁর ভালো লাগবে,” শনিবার নিজ দলের ম্যাচের পর সাংবাদিকদের বলেন বোক্যা জুনিয়র্সের মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেস।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মেসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ইন্টার মায়ামির সতীর্থ মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পলও আর্জেন্টিনায় গেছেন। শনিবার মায়ামিতে মন্তেরেরির কাছে ২-১ গোলে হারের ম্যাচে গোল করার পর ডি পল নিজের জার্সি খুলে মেসির ১০ নম্বর জার্সি প্রদর্শন করে বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
কবরস্থানের বাইরে অল্প কয়েকজন সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ১৫ বছর বয়সী লুকাস ব্ল্যাঙ্কো। তিনি কবরস্থানের ফটকে “শক্ত থাকো, মেসি” লেখা একটি পোস্টার ঝুলিয়ে দেন। তিনি বলেন, “মেসি এই দেশকে এত আনন্দ দিয়েছেন, এখন আমাদের পালা তাঁকে কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার এবং তাঁকে কিছুটা সান্তনা দেওয়ার।”
বুয়েনস আইরেসের দক্ষিণের শহর ত্রেস আরোইয়োস থেকে ৭০০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে আসা কার্লোস ও আনা নামের এক দম্পতি বলেন, “আমরা এখানে আসার জন্য ৭০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছি। এই সময়ে আমরা লিওর পাশে থাকতে চেয়েছি।”
মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি, তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হোর্হে মেসি ক্যানসারে ভুগছিলেন। জুনে বিশ্বকাপে চলাকালীন তাঁর অস্বাভাবিক অনুপস্থিতি সবার নজর কেড়েছিল। মেসির পরিবার বিশ্বকাপ চলাকালে হোর্হের স্বাস্থ্য নিয়ে অব্যাহত গুঞ্জনের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের কাছে “মানবিকতা” দেখানোর আহ্বান জানিয়েছিল।
৩৯ বছর বয়সী মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেছিলেন, “খেলার বাইরের একটি পরিস্থিতি” নিয়ে তিনি মোকাবিলা করছিলেন। পরে মেসি বলেন, “আমি কয়েকটি কঠিন, জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে গেছি। কিন্তু পুরো প্রতিনিধি দল ও আমার সতীর্থদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ, কারণ তারা সবসময়কার মতো আমার পাশে ছিল।”
স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পরপরই মেসি কয়েক দিনের জন্য পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে রোসারিওতে ফিরে গিয়েছিলেন।
ছেলের পুরো ক্যারিয়ারে পথপ্রদর্শক হিসেবে থাকা হোর্হে মেসিই ছিলেন তাঁর প্রথম কোচ। ছেলের সঙ্গে থাকতে তিনি নিজের সবকিছু পেছনে ফেলে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
হোর্হে বুয়েনস আইরেস থেকে ৩৪০ কিলোমিটার উত্তরের শহর রোসারিওতে মেটাল ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় ছোট ক্লাব গ্রানদোলির যুব দলগুলোর কোচও ছিলেন। চার বছর বয়সে স্থানীয় শিশুদের খেলার জন্য ব্যবহৃত খালি জায়গায়
আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ অধিনায়ককে ফুটবলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তিনিই।
২০০০ সালে তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। মাত্র ১৩ বছর বয়সী প্রতিভাবান মেসিকে বার্সেলোনা চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ক্লাবটির যুব দলে খেলার জন্য ক্যাটালোনিয়ায় আমন্ত্রণ জানায়। মেসির গ্রোথ হরমোনের ঘাটতির চিকিৎসা চলছিল তখন।
হোর্হে আর্জেন্টিনায় নিজের চাকরি, স্ত্রী এবং অন্য তিন সন্তানকে রেখে মেসির সঙ্গে স্পেনে চলে যান।
পরে মেসি বলেছিলেন, “আমরা যখন বার্সেলোনায় পৌঁছাই, আমি একা কাঁদার জন্য নিজের ঘরে নিজেকে আটকে রাখতাম। আমার বাবাও একই কাজ করতেন, হয় আমি তাকে দেখতে পেতাম না, অথবা তিনি ভাবতেন আমি তাকে দেখিনি। আমরা দুজনেই ভালো আছি এমন ভান করতাম, কিন্তু আমরা সংগ্রাম করছিলাম।”
পরবর্তী সময়ে বাবাই মেসির এজেন্ট হিসেবে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতেন, বার্সেলোনা থেকে পিএসজি এবং পরে ইন্টার মায়ামি পর্যন্ত বাবাই মেসিকে সহযোগিতা করেছেন।
গত শনিবার থেকে ফুটবল বিশ্বের শোকবার্তা আসতে থাকে। মেসি যেসব ক্লাবে খেলেছেন, সেসব ক্লাবের পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনও সমবেদনা জানিয়েছে।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) সব ম্যাচ শুরুর আগে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং সপ্তাহজুড়ে সব বয়সভিত্তিক ম্যাচে খেলোয়াড়দের কালো ব্যাজ পরার নির্দেশ দিয়েছে।