বিলালের যে আজান শুনে কান্নায় ভেসেছিল মদিনা
ওয়েভ ফেইথ
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:০০
রাতের শেষ প্রহর, মদিনার আকাশ-বাতাস তখন নিস্তব্ধ। এক দীর্ঘশ্বাসের মতো ভারী হয়ে আছে চারদিক। হঠাৎ এই নিস্তব্ধতা কেটে দরদমাখা কণ্ঠে ভেসে এল— ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি। পুরো মদিনা শহর যেন থমকে দাঁড়াল। মদিনাবাসী তাদের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। এই কণ্ঠ তাদের খুব চেনা ও আপন। মানুষজন ঘর থেকে বের হয়ে আসতে শুরু করলেন। গোটা মদিনায় পড়ে গেল কান্নার রোল। মদিনাবাসী সাক্ষী হলো এক অশ্রুসিক্ত দিনের। ১৪০০ বছর আগের এক আজান ইসলামের ইতিহাসে হয়ে আছে একক অনন্য বিরহগাঁথা।
মহানবী (সা.)-এর প্রতি সাহাবীদের ভালোবাসা ছিল অতল সমুদ্রের মতো। কিন্তু বিলাল (রা.)-এর ভালোবাসা ছিল আরও গভীর। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে নবীজির ইন্তেকালের পর মদিনা বিলালের জন্য হয়ে উঠলো এক অচেনা ও অসহ্য নগরী। মদীনার পথে হাঁটলেই নবীজির স্মৃতি মনে পড়তে লাগল বিলালের। মেহরাবের দিকে তাকালে বিলালের চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল নবীজির নূরানি মুখচ্ছবি। ফলে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়লেন বিলাল (রা.)। তিনি আর মদিনায় টিকতে পারলেন না। বিশেষ করে আজান দিতে গেলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তে লাগলেন। ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলার সময় তাঁর গলা বুজে আসত, বুক ফেটে কান্না আসত। বিলাল (রা.) খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূলের খলিফা! আমাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দিন। আমি আর এই মদিনায় থাকতে পারছি না।" শেষ পর্যন্ত তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে মদিনা ত্যাগ করলেন। বছরের পর বছর কেটে গেলে বিলাল আর মদিনায় ফিরলেন না।
বহু বছর পর এক রাতে প্রিয় নবীকে স্বপ্নে দেখলেন বিলাল (রা.)। মহানবী তাঁকে বললেন, "বিলাল! একি তোমার নিষ্ঠুরতা! তোমার কী আমাদের সাথে দেখা করতে ইচ্ছে করে না?" ঘুম ভেঙে বিলাল (রা.) অস্থির হয়ে উঠলেন। দুচোখের পানি মুছতে মুছতে তখনই মদিনার পথে রওনা হলেন। যখন তিনি মদিনায় পৌঁছালেন, তখন তার চুল-দাড়ি পেকে সাদা হয়ে গেছে। নবীজির রওজায় গিয়ে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
নবীজির দুই নাতি হাসান ও হুসাইন (রা.) বিলালের কাছে আবদার করলেন, "হে বিলাল! আমরা আপনার কণ্ঠে সেই আজানটি শুনতে চাই, যা আপনি আমাদের নানাজানের সামনে দিতেন।" বিলাল তাঁদের ফেরাতে পারলেন না। ফজরের সময় হলে বিলাল (রা.) মসজিদের ছাদে উঠলেন। মদিনার আকাশ-বাতাস তখন নিস্তব্ধ। দীর্ঘ কয়েক বছর পর যখন বিলালের সেই পরিচিত ও দরদমাখা কণ্ঠ ভেসে এল— ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’, পুরো মদিনা শহর যেন থমকে দাঁড়াল।
মদিনাবাসী নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যখন তিনি বললেন ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তখন ঘর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে শুরু করল। আর যখন বিলাল তাঁর সেই কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন— ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’, তখন গোটা মদিনায় কান্নার রোল পড়ে গেল। বিলাল (রা.) নিজেও আর আজান শেষ করতে পারছিলেন না। কান্নায় তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মদিনার ইতিহাসে সেই দিনটি ছিল নবীজির বিদায়ের দিনের পর সবচেয়ে বেশি অশ্রুসিক্ত একটি দিন। বিলাল (রা.)-এর এই গল্প আমাদের শেখায়, বিরহ ভালোবাসাকে আরও প্রগাঢ় করে তোলে।