মহানবীকে বাঁচাতে বুক পেতে দিয়েছিলেন যে নারী


ওয়েভ ফেইথ

ওয়েভ ফেইথ

১৪ এপ্রিল, ২০২৬

মহানবীকে বাঁচাতে বুক পেতে দিয়েছিলেন যে নারী

উহুদের তপ্ত বালুতে তখন তলোয়ারের ঝনঝনানি। মদিনার প্রান্তে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। হঠাৎ মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখে পড়ল। কাফেরদের আক্রমণ এতই তীব্র হলো যে, স্বয়ং মহানবী (সা.)-এর প্রাণ রক্ষা করাই কঠিন হয়ে পড়ল। চারদিকে হাহাকার আর বিশৃঙ্খলা। ঠিক সেই মুহূর্তে মহানবীর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন এক সাহসী নারী। তাঁর এক হাতে তলোয়ার আর অন্য হাতে ধনুক। নিজের শরীরকে ঢাল বানিয়ে বাঁচালেন প্রিয় নবীকে।

 

বদর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের যন্ত্রণা তখনো ভুলতে পারেনি কুরাইশরা। প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করে তারা। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মদিনার দিকে অগ্রসর হল। তাদের লক্ষ্য ছিল ইসলামকে সমূলে বিনাশ করা। বিপরীতে মহানবী (সা.) এক হাজার সৈন্য নিয়ে বের হলেও পথিমধ্যে ৩০০ মুনাফিক সৈন্য দলত্যাগ করল। অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনী ওহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে অবস্থান নিল। এই দলেই ছিলেন এক নারী। তাঁর কাজ ছিল মূলত তৃষ্ণার্ত সৈনিকদের পানি পান করানো এবং আহতদের সেবা করা।

 

শুরু হলো যুদ্ধ। উহুদের ময়দান তখন রণক্ষেত্র। শুরুতেই কাফেরদের কোনঠাসা করে ফেলল মুসলিমরা। কিন্তু একপর্যায়ে হঠাৎ যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। মুসলিম বাহিনীর একটি ভুলের সুযোগ নিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ পেছন থেকে আক্রমণ করল। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল বিশৃঙ্খলা। এমনকি গুজব রটে গেল— মহানবী (সা.) শহীদ হয়েছেন! কাফেরদের একটি দল যখন সরাসরি নবীজিকে আক্রমণের চেষ্টা করছিল, তখন তপ্ত বালু আর লাশের স্তূপের মাঝখান থেকে সিংহীর মতো গর্জে উঠলেন সেই নারী। নাম তার নুসাইবা (রা.)। কোনো ঢাল ছাড়াই তলোয়ার আর ধনুক হাতে তিনি নবীজির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। অনেক অভিজ্ঞ যোদ্ধা যখন পিছু হটছিলেন, তখন নুসাইবা তাঁর স্বামী ও দুই ছেলেকে নিয়ে নবীজির চারপাশে এক অভেদ্য মানবপ্রাচীর তৈরি করলেন।

 

ইবনে কামিয়াহ নামের এক কুখ্যাত কাফের যখন নবীজিকে আঘাত করতে আসছিল, নুসাইবা বুক পেতে সেই আঘাত রুখে দিলেন। তাঁর কাঁধে তৈরি হল গভীর ক্ষত, রক্তে ভিজে গেল জমিন। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো ‘উফ’ শব্দ ছিল না। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) পরবর্তীতে বলেছিলেন— "উহুদের যুদ্ধে আমি ডানে-বামে যেদিকেই তাকিয়েছি, দেখেছি উম্মে আম্মারা আমাকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছেন।"

 

নুসাইবা বিনতে কাব ছিলেন মদিনার বিখ্যাত বনু নাজ্জার গোত্রের সন্তান। তিনি ইসলামের শুরুর দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি ‘উম্মে আম্মারা’ নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর বীরত্ব কেবল উহুদেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তীকালে মুসায়লামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধেও তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে একটি হাত হারান।

 

নুসাইবা (রা.) প্রমাণ করে গেছেন, ইসলামে নারীর ভূমিকা কেবল ঘরের কোণে নয়, বরং প্রয়োজনে তাঁরা ময়দান কাঁপানোর ক্ষমতা রাখেন। তাঁর অসীম সাহসিকতা দেখে নবীজি (সা.) দোয়া করেছিলেন, যেন জান্নাতেও তিনি তাঁর সাহচর্য পান। ইসলামের ইতিহাসে তিনি এক অপরাজেয় ও অনন্য প্রতীক।

Share this article

https://mail.thewave24.com/view/103/news

© 2026 TheWave24. All rights reserved.